রাজনীতির বাতিঘর বাদলকে হারানোর এক বছর

0
142

স্বপ্ন দেখতেন, স্বপ্ন দেখাতেন। স্বপ্ন দেখতেন একটি স্বাধীন, দারিদ্র্যমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের। লাল-সবুজের ক্যানভাসে আঁকতেন একটি সৃজনশীল ও রুচিশীল সমাজের ছবি। যেখানে থাকবে না কোনো হিংস্রতা, শত্রুতা, লুটপাট, দুর্নীতি, বিচারহীনতা। তার চিন্তা মননে ছিল না সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প কিংবা জঙ্গিবাদের আখ্যান। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা মইন উদ্দিন খান বাদল।

দেশের রাজনীতির একজন বাতিঘর। রাজনীতির ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর অন্যতম সাক্ষী। কোনো বাধাই তাকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি। আন্দোলন সংগ্রামে অগ্রসর হতেন সাহসিকতার সঙ্গে। এগিয়ে এসেছেন দেশের নানা সঙ্কটেও। স্বাধীনতার পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে কাজ করে গেছেন আমৃত্যু।

বোয়ালখালী (চট্টগ্রাম-৮) আসনের প্রয়াত সংসদimageসদস্য মইন উদ্দিন খান বাদলের আজ প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। চট্টগ্রামের অধিকার ও উন্নয়ন নিয়ে আমৃত্যু লড়ে যাওয়া বর্ষীয়ান এ নেতা গেল বছরের ৭ নভেম্বর ভারতের বেঙ্গালোর দেবী শেঠীর নারায়াণ হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুকে বরণ করেন। যদিও বা বোয়ালখালীবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি কালুরঘাট সেতু তৈরি না হওয়ার আক্ষেপ নিয়েই চিরবিদায় নিতে হয়েছিল বাদলকে। যে সেতুর জন্য তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে পদত্যাগেরও ঘোষণা দিয়েছিলেন।

বোয়ালখালী উপজেলার সারোয়াতলীতে প্রয়াত সাংসদের কবর প্রাঙ্গণে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে আজ শনিবার বিকেলে তাকে স্মরণ করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে- বাংলাদেশ জাসদ বোয়ালখালী উপজেলা কমিটির উদ্যোগে বিকেল ৩টায় খতমে কোরআন, দোয়া মাহফিল ও স্মৃতিচারণ। 

ছাত্রলীগের রাজনীতি থেকে উঠে আসা বাদল ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। বাঙালিদের ওপর আক্রমণের জন্য পাকিস্তান থেকে আনা অস্ত্র চট্টগ্রাম বন্দরে সোয়াত জাহাজ থেকে খালাসের সময় প্রতিরোধের অন্যতম নেতৃত্বদাতা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর মৌলভী সৈয়দের সঙ্গে কাজ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন বাদল। জাসদ, বাসদ হয়ে পুনরায় জাসদে ফিরেন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দল গঠনেও তার ভূমিকা ছিল উল্লেযোগ্য।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বোয়ালখালীর সারোয়াতলী গ্রামে জন্ম মইন উদ্দিন খান বাদলের। চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চাঁন্দগাও) আসন থেকে মইন উদ্দিন খান বাদল ২০০৮ সাল থেকে টানা তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ছিলেন একাদশ জাতীয় সংসদের ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সদস্য। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) একাংশের কার্যকরী সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন।

সংসদ সদস্য মইন উদ্দিন খান বাদল ছিলেন জাতীয় সংসদ অধিবেশনের প্রাণ। তথ্যবহুল, জোরালো ও যুক্তি-নির্ভর বক্তব্য নিয়ে সংসদ অধিবেশনে উপস্থিত হতেন। দেশের রাজনীতিতে তত্ত্ব ও উদ্ধৃতি দিয়ে নিজের বক্তব্য উপস্থাপনের ভিত্তি রচনা করতেন, যা স্পর্শ করত মানুষের মর্মকে। সংসদে ও সংসদের বাইরে টকশোতেও অনলবর্ষী বক্তা হিসেবে সুখ্যাতি ছিল প্রয়াত এ রাজনীতিকের।

গত বছরের ১৮ অক্টোবর বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান পিপলস ত্রিদেশীয় কমিটির সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে কমিটির সভায় যোগ দিতে বাদল কলকাতা যান। এর এক সপ্তাহের মাথায় অর্থাৎ ২৫ অক্টোবর চেকআপ করাতে যান বেঙ্গালুরু নারায়ণা হৃদয়ালয়ে। সেখানে এনজিওগ্রামের পরে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো ব্রেন স্ট্রোক করেন এবং তার নিউমোনিয়া ধরা পড়ে। তখনই তাকে আইসিইউতে রাখা হয়। পরে ৭ নভেম্বর ভোরে মারা যান।

মুক্তিযোদ্ধা, বর্ষীয়ান রাজনীতিক ও পার্লামেন্টারিয়ান মইন উদ্দিন খান বাদলের হাত দিয়েই ঐতিহ্যবাহী বোয়ালখালী উপজেলার আধুনিকতার ছোঁয়া। দীর্ঘদিন সাংসদ থাকার সুবাদে নিজ এলাকার আমূল উন্নয়ন করেছেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সড়ক, সেতু, নতুন সড়কের উন্নয়ন, মাদ্রাসা, মসজিদ, সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের উন্নয়নে বোয়ালখালীকে করেছেন সমৃদ্ধ। তার সংসদীয় আসনের আংশিক শহরাঞ্চল। এই অংশে পাঁচলাইশের আশেকানে আউলিয়া ডিগ্রি কলেজ সরকারিকরণ, ষোলশহরে টেক্সটাইল অ্যান্ড জুট ইনস্টিটিউট করা, মোহরায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বঙ্গবন্ধু মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শুরু হয় তার হাত ধরেই। এ ছাড়াও চান্দগাঁওতে ১ হাজার কর্মজীবী নারীর বাসস্থান নির্মাণ ও অত্যাধুনিক সরকারি গুদাম নির্মাণ হয়েছে। পাশাপাশি মসজিদ, মন্দির, মাদ্রাসায় দেওয়া হয়েছিল ব্যাপক অনুদান।

টানা ১১ বছর সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় বোয়ালখালীতে প্রায় ২১৩ কিলোমিটার রাস্তা পাকাকরণ করেছিলেন সাংসদ মইন উদ্দিন খান বাদল। তার আমলে প্রায় ৫০টির মতো প্রাইমারি স্কুল পাকা করা হয়। বোয়ালখালীতে প্রথমবারের মতো ৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে কর্ণফুলী সংলগ্ন এলাকার ভাঙন রোধে বাঁধ নির্মাণ হয়। অগ্নিদুর্ঘটনা রোধে বোয়ালখালীতে ফায়ার স্টেশন ও এলাকার প্রত্যেকটি হাইস্কুলে পাকা ভবন করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মুক্তিযুদ্ধ কমপ্লেক্স নির্মাণ ও কধূরখীল উচ্চ বিদ্যালয়কে সরকারীকরণ করা হয়েছে বাদলের হাত ধরেই।

ডিসেম্বরের মধ্যে কালুরঘাট রেল কাম সড়ক সেতু নির্মাণ না হলে সংসদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিলেন চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য মইন উদ্দিন খান বাদল। তাকে আর সে সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়নি সেতুও যেমন নির্মাণ হয়নি তেমনি তিনিও এই দুনিয়ার সব হিসাব চুকিয়ে চলে যান পরপারে। তবে তিনি এখনো চট্টগ্রামের চান্দগাঁও-বোয়ালখালীবাসীর মন মন্দিরে রয়েছেন সযত্নে।

LEAVE A REPLY