শাহ আমানত বিমানবন্দরে পদে পদে যাত্রী হয়রানি, ‘কন্ট্রাক্ট’ না থাকলেই যাত্রা বন্ধ

0
2199

শাহ আমানত এয়ারপোর্টে যাত্রী হয়রানি চরমে পৌঁছেছে। সেখানে এমনকি বিদেশগামী যাত্রীদের টাকা-পয়সা কেড়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। বিমানবন্দরে বিদেশগামী যাত্রীদের বোর্ডিং পাস নেওয়ার পরই শুরু হয় নানা ধরনের হয়রানি। এরপর বিমানে ওঠার আগ পর্যন্ত চরম ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যেতে হয় যাত্রীদের। এমনকি ইমিগ্রেশন হওয়ার পরও চলে মানসিক ব্ল্যাকমেইলিং। নানা সমস্যার অজুহাত দেখিয়ে সমাধানের কথা বলে হাতিয়ে নেওয়া হয় টাকা। বিদেশগামী যাত্রী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

চট্টগ্রামের হাটহাজারীর রকিব উদ্দিন গত শনিবার (২১ নভেম্বর) সন্ধ্যায় বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে আরব আমিরাতের দুবাই যাচ্ছিলেন। ওইদিন তিনি বিকেলেই ঢোকেন চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। নিচ থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে বোর্ডিং পাস নিয়ে ওপরে যেতেই এক লোক এসে তার পাসপোর্টটি নিয়ে যান। তিন ঘন্টা পর তাকে পাসপোর্ট ফেরত দিয়ে বলেন, ‘আপনার ইমিগ্রেশন হয়েছে। আপনি দুবাইতে যেতে পারবেন না।’ পরে অপর এক লোক এসে বলেন আপনার কাছে বাংলাদেশি টাকা আছে? উত্তরে ‘আছে’ বলায় ওই ব্যক্তি বলেন, বাংলাদেশি টাকা নিয়ে দুবাই এয়ারপোর্ট থেকে বের হতে পারবেন না। তাই আপনার কাছে থাকা বাংলাদেশি টাকাগুলো দিয়ে যান। এভাবে বলে তার কাছ থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকা নিয়ে নেন। ওইদিন শুধু রকিব নয়, তার সঙ্গে দুবাইগামী ১৫ থেকে ২০ জন যাত্রী থেকে এভাবে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে টাকা।

রকিব বলেন, ‘এয়ারপোর্টের ভেতরে যা যা হয়রানি করা হয়, তা বলে শেষ করা যাবে না। বিভিন্ন লোক বারবার এসে বিরক্ত করেন যাত্রীদের। বিরক্ত হয়ে আমি সব টাকা দিয়ে দিয়েছি। কিন্তু আমার কাছে ডলার ছিল। সেগুলো নেয়নি।’

চট্টগ্রাম নগরীর ফতেয়াবাদ এলাকার সরওয়ারের ব্যবসা আছে দুবাইতে। অংশীদাররা ওই ব্যবসা দেখাশোনা করলেও তিনি বছরে দুবার দুবাই যান ভিজিট ভিসা নিয়ে। আবার নিদিষ্ট সময়ে ফিরেও আসেন। কিন্তু তাকে এবার যেতে দেয়নি ইমিগ্রেশন পুলিশ। রকিবের মতো একইভাবে তার পাসপোর্টও নিয়ে গিয়ে ফেরত দেওয়া হয় ফ্লাইট ছাড়ার আগে। কারও সঙ্গে কথা বলার সুযোগও পাননি তিনি। পরে তাকে জানানো হলো ভিজিট ভিসায় যেতে পারবেন না। অথচ ভিজিটর হিসেবে যাওয়ার অধিকার আছে তার।

সরওয়ার বলেন, ‘আমি দুবাইতে গেছি। আবার ফিরেও এসেছি। কিন্তু আমাকে বলা হলো আমি যেতে পারবো না। এভাবে আমি ছাড়াও আরও ২৫ থেকে ৩০ জনকে যেতে দেয়নি বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন পুলিশ।’

দুবাই প্রবাসী শাহরিয়ার আলম সাহেদ জানান, ‘গত ৮ বছরেরও বেশি সময় ধরে আমিরাতে বাংলাদেশিদের ভিসা বন্ধ। এতে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের প্রতিষ্ঠানগুলো দেশি শ্রমিকের অভাবে ভালোভাবে ব্যবসা করতে না পারায় প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার ভিজিট ভিসায় বাংলাদেশিদের বৈধভাবে আমিরাতে আসার সুযোগ দিলেও তারা ভিসা পরিবর্তন করে কোনো কাজে যোগ দিতে পারতো না। সম্প্রতি ভিজিট ভিসায় আমিরাতে আসার পর ভিসা স্ট্যাটাস পরিবর্তন করে কোম্পানির ভিসা বা পার্টনার ভিসা লাগানোর সুযোগ করে দিয়েছে আমিরাত সরকার। কিন্তু বাংলাদেশের এয়ারপোর্টে ভিজিট ভিসাধারীদের আটকে দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, বিমানবন্দরের কিছু অসাধু কর্মচারী বৈধ ভিজিট ভিসাসহ যাবতীয় ট্রাভেল ডকুমেন্ট থাকা সত্বেও ভিজিট ভিসাধারীদের আসতে বাধা দিচ্ছে। তারা কেবল ‘কন্ট্রাক্ট বাণিজ্যে’র মাধ্যমে ভিজিট ভিসাধারীদেরই আসতে দিচ্ছে। যারা ‘কন্ট্রাক্ট’ করছে না, তাদের আটকে দিচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আমরা আরও ক্ষতিগ্রস্থ হবো। বাংলাদেশ থেকে ৫০ হাজার টাকা বিমান ভাড়ায় যেখানে আমিরাতে আসতে পারতেন, এখন তাদেরকে দেড় লাখ থেকে এক লাখ আশি হাজার টাকায় তথাকথিত ‘চুক্তি’তে আসতে হচ্ছে— যার ব্যয়ভার বহন করা সাধারণ মানুষের পক্ষে দুঃসাধ্য।

বিমানবন্দর ও ইমিগ্রেশনে অহেতুক এই সমস্যার সমাধানে প্রবাসীরা প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী এবং বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান অধিদপ্তরের চট্টগ্রামের উপপরিচালক জহিরুল ইসলাম জানান, ‘চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দর দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের আরব আমিরাত, দুবাই, ওমান, কাতার, কুয়েত, সৌদি আরবে যাচ্ছেন যাত্রীরা। করোনায় লকডাউন থাকার পর পুনরায় ফ্লাইট চালু হওয়ার সাথে সাথে আটকেপড়া যাত্রীরা বিদেশে যাচ্ছেন। প্রতিদিন গড়ে ৭০০ থেকে ১০০০ যাত্রী বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন চট্টগ্রাম থেকে।’

তিনি বলেন, ‘যাত্রীদের হয়রানি না করার জন্য আমরা ইমিগ্রেশন পুলিশের সমন্বয়ে সভা করেছি বিমানবন্দরে। এরপরও কিছু কিছু হয়রানির কথা শোনা যায়। তবে আমরা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাই না। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেবো।’

তিনি বলেন, ‘ভিজিটের ক্ষেত্রেও যারা প্রকৃত ভিজিটর, তাদের যেন বিমানবন্দর থেকে ফেরত দেওয়া কিংবা হয়রানি করা না হয় সেই নির্দেশনা দিয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী নিজেই।’

LEAVE A REPLY